-: advertisement :-

অধিক সাহস


হেতমপুরের মাঠের ঠিক মাঝখানে রােজ ভােরবেলা উঠেই লরীর চাকার দাগ দেখা যায়, এই লরী কোত্থেকে আসে, কোথায় যায় কেউ বলতে পারে না।

হেতমপুরের মাঠের একপাশে পাঁচু মণ্ডলের বাড়ি। মণ্ডল বলে ? মাঝরাতে লরী চলার শব্দ আর হইচই। চীকার চেঁচামেচিও শােনা যায় আবার কিছু পরে একদম চুপ। কোত্থেকে যে লরীটা আসে, কোথায় বা যায়.....কেউ বলতে পারে না।

তবে মাঝে মাঝেই লরী চাপা পড়ে হেতমপুরের মাঠে লােক মারা যায়। | হেতমপুর থানার বড়াে দারােগা বিপদতারণ চক্রবর্তী মশাই, এই নিয়ে বহু তদন্ত করেছে, কিন্তু লরীর কোনাে হদিশ করে উঠতে পারেননি।

লরীটা অবশ্য বড়াে রাস্তা থেকেই আসে এবং মাঠের মাঝ বরাবরই যায়, তারপর মাঠের মাঝ থেকে আর লরীটার কোনাে হদিশ পাওয়া যায় না, চাকার দাগও পাওয়া যায়

।।

মাঠের মাঝখান থেকেই লরীটা যেন কোথায় উধাও হয়ে যায়। | ছােটো দারােগার মতে ঃ এটা কোনাে লরী বা এ অঞ্চলের ব্যাপার নয়।

-তবে?

ওপর থেকে অর্থাৎ মহাশূন্যের অন্য কোনাে গ্রহ থেকে এখানে কোনাে যান। নামে এবং মাঠের মধ্যে কেউ থাকলে ঐ যান তাকে যান তাকে পিষে যায় —বুঝলেন? যদি লরীই হােত, মাঝ মাঠ থেকে চাকার দাগ থাকবে না কেন বলুন?

বড়াে দারােগা বললেন ঃ এই কারণেই তাে.ভেবে-চিন্তে কোনাে সূত্র পাচ্ছিনা মশাই।

— আর লরীটা যদি মাঝমাঠ থেকে বড়াে রাস্তার দিকে ফিরেই আসে, ততে ফেরার পথের চাকার দাগ তাে থাকবে, তা নেই কেন? |

ছােট দারােগার যুক্তি অকাট্য, বড়াে দারােগা মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বললেন : তাতাে বটেই...কিন্তু ওপরওয়ালাদের কাছেকিলিখি বলুন তাে...

যা দেখতে পাচ্ছি, তাই লিখে দিন, অর্থাৎসত্যি কথাটাই লিখে দিন।

, বড়ােবাবু ভালাে মনে সত্যি কথাটাই পুলিশ সুপারের কাছে লিখে পাঠালেন, সেই সঙ্গে ছােটবাবুর মতামতও।

এক হপ্তা পরে পুলিশ সুপার স্বয়ং এলেন হেতমপুরের থানায়, এসেই থানার বড়বাবু আর ছােটবাবুকে তলব করলেনঃ আপনাদের কি মাথা-ফাতা খারাপ হয়ে গেছে নাকি?

বড়বাবু মাথা চুলকে জিজ্ঞেস করলেন : কেন স্যার? —হেতমপুরের মাঠেলরী একসিডেন্টের রিপাের্টে কি লিখেছেন? —আমরা তদন্ত করে যা পেয়েছি, তাই লিখেছিস্যার।

-মুণ্ডু লিখেছেন। স্পেস শীপ আর জায়গা পেল না, এতাে জায়গা থাকতে হেতমপুরের মাঠে নামতে গেল? এই স্পেসশীপের আইডিয়া কার মাথায় এসেছে শুনি?

' বড়বাবু ঢােক গিলে বললেন ঃ আমি যখন এ ব্যাপারে মাথা-মুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছিলুমনা অর্থাৎলরীর চাকার দাগ দেখলুম মাঠের এককোণ থেকে শুরু হয়ে মাঠের মাঝখান পর্যন্ত গেছে, তারপরই উধাও, কোনাে দাগ-ফাগ কিস্যু , নেই – তখনই ছােটোবাবু বললেন ওটা মহাশূণ্য থেকে আসা কোনাে মহাযানের কারবার। হয়তােবা ঐ যান যখন নীচে নামে তখন তার চাকা লরীর মতােই। | - চলুন আগে জায়গাটা দেখে আসি, তারপর ছােটোবাবুকে রাচীর পাগলা গারদে পাঠাবার ব্যবস্থা করছি। * পুলিশ সুপারের কথা শুনে হেতমপুরের ছােট দারােগার মুখ আমসীর মতাে হয়ে গেল।

কিন্তু অকুস্থলে গিয়ে সব কিছুপরখ করে পুলিশ সুপারের চোখ ট্যারা হয়ে গেল। সত্যিই তাে লরীর চাকার দাগ মাঠের কোণ থেকে শুরু হয়ে মাঠের মাঝ বরাবর এসে শেষ হয়েছে, তারপর আর চাকার দাগ নেই, লরীটা যে ফিরে গেছে তারও কোনাে প্রমাণ নেই।

পুলিশ সুপার বড় দারােগাকে জিজ্ঞেস করলেন ঃ মকবুল মিয়ার লাশ কোথায় পাওয়া গেছে।

– মাঠের মাঝখানের কিছু আগে লরীর চাকার দাগের মধ্যেই, সেখানে কিছু রক্তও আছে, জমাট বাঁধা রক্ত।

পুলিশ সুপার সেই জমাট বাঁধা রক্তও দেখলেন, তারপর বড়বাবুকে জিজ্ঞেস করলেনঃ পােস্ট মর্টম রিপাের্ট কি বলছে?

| লরীর চাকায় পিষ্ট হয়েছে, সেটাই মৃত্যুর কারণ, কিন্তু মরার আগে সে কোনাে কারণে অসম্ভব ভয় পেয়েছিল স্যার। লাশের যে ফটো নেওয়া হয়েছিল, তাতেও দেখা গেছে—তার দু'চোখই বিস্ফারিত এবং আর একজন বিশেষজ্ঞের মতে—লরীর চাকায় পিষ্ট হওয়ার আগেই মকবুল মিয়া হার্টফেল করে মারা গেছে।

বলেন কী! -হ্যা, স্যার।

পুলিশ সুপার তার মাথার টাকে হাত বুলােতে বুলােতে বললেন ঃ ব্যাপারটা দেখছি বেশ গােলমেলে। ছােট দারাগাবাবুর কথাটা একদম উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

তাছাড়া এই অঘটনের অন্য কোনাে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা করাও সম্ভব হচ্ছেনা। পুলিশ সুপারের কথা শুনে ছােটবাবু হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন।

বড় দারােগা মাথা চুলকে পুলিশ সুপারকে জিজ্ঞেস করলেন ঃ এখন আমাদের। কি কর্তব্য, স্যার?

— আচ্ছা এখানে এ পর্যন্ত লরী চাপা পড়ে কতজন লোেক মারা গেছে? —তা স্যার, গত কয়েক বছর মিলিয়ে সত্তর জন।

ব্যাপারটা অত্যন্তগুরুত্বপূর্ণ।আজ থেকেই মাঠেপুলিশ-পিকেটবসান। প্রতিরাতে চারজন করে আমর্ড কনেষ্টবল এ মাঠে ক্যাম্প করে থাকবে, দেখা যাক কি হয়? আমিও কয়েকদিন এখানকার ডাকবাংলােয় থাকছি, ব্যাপারটার একটা হেস্তনেস্ত করেই সদরে ফিরে যাব। . — আজ থেকেই কি পুলিশ পিকেট বসাব, স্যার?

— নিশ্চয়ই।

অতএব সেদিন থেকেই পুলিশ সুপারের নির্দেশে হেতমপুরের মাঠেপুলিশ পিকেট বসানাে হলাে। একটা তাবুও খাটানাে হলাে। হ্যাজাক লাইটেরও ব্যবস্থা করা হােল।

সেদিন রাতে অবশ্য কিছু ঘটল না, কোনাে লরীর আওয়াজও শােনা গেল না, | কোনাে হইচই বা চীৎকারও শােনা গেল না। । পরদিন শনিবার, তায় অমাবস্যা। সন্ধ্যা থেকেই পুলিশের হেতমপুরের মাঠের | তাবুতে হাজির। হ্যাজাক জ্বালা হয়েছে—চারজনে মিলে দিব্যি তাস খেলাও চলছিল।

" পুলিশ সুপার তাে নির্দেশ দিয়েই রেখেছেনঃসন্দেহজনক কিছু দেখতে পেলে সঙ্গে সঙ্গে গুলি করবে। একটুও দ্বিধা করবে না।

• বড়বাবু বেশ নাক ডাকিয়ে ঘুমােচ্ছিলেন নিজের কোয়ার্টারে। পুলিশ সুপারও ডাকবাংলােয় দিব্যি ঘুমুচ্ছিলেন। এমন সময় কনেষ্টবল রামভজন পাড়ে এসে চীৎকার। করে ডাকলঃ হুজুর, উঠুন উঠুন। বড়ে বাবু, বড়ে বাবু।

রামভজন পাড়ের ডাকাডাকিতে বড়বাবু ধড়ফড়িয়ে উঠে জিজ্ঞেস করলেনই চিল্লাতা হ্যায়, আভিতক রাত হ্যায় —নি হারাম করা দিয়া।

হুজুর উধারে যে সর্বনাশ হইয়া গেল। - কেন?

উহা তিনজন কনেষ্টবল, তাবুকে লরীকে নিয়ে একদম পিষিয়ে গেল। আমি পিছাব করতে জরা বাহার গিয়েছিলাম তাই বাঁচিয়া রইলাম।

—সব খুলকে বাতাও, কেইসে ক্যায়া হুয়া ?

– হুজৌর রাত সাড়ে এগার তক সব কিছু ঠিকই থা, কই গড়বড় নেহী। সব শুনশান থা।

— তব?

—হামিলােগ তাস খেলতে আছিলাম। বারাে বাজনামে তব সিরিফ পাঁচ মিনিট বাকি থা। হামার টাট্টি পাইয়ে গেল, তব হাম লােটা আর টর্চ লেকে জরা দুরকা এক ঝােপকা আড়ালাম গিলাম, টাট্রিভি বসলাম।

—তা ? একঠো লরীকা শব্দ পাইলাম, সামনের হেডলাইটের জোরালাে আলাে। - তব?

– বহুৎ স্পীড ভি। আমি'টাট্টিতে বসেই চীৎকার করে ওদের বললাম—লরী আইলবা, গােলি চালাও, গােলি চালাও।।

তারপর কি হলাে?

—তিনটে ফারারিং ভি হইল। তারপর চীৎকার ভি হইল। হাম জলদি ছুট গয়া, লরীকা ড্রাইভারকা কেবিনকে ফোকাস কিয়া।

—হা, দেখা? —হুজোর আপ বিশােয়স যাইবেন। -বলাে, বলাে কি দেখলে?

—টকা ফোকাসকা দেখা ড্রাইভার কা সীটমে একটো কঙ্কাল হুজুর। • কঙ্কাল ?

–হ্যা, হুজৌর। কঙ্কাল চোখসে এক নীলা যেইসা আলাে ভী। হুজৌর আমি আর মাঠেনাইমতে পারলাম না। হুজৌর হামারা মাথা ঘুরে গেল অজ্ঞান হইয়ে পইরে গেল,যখন ভাের হইল, জ্ঞেয়ন ফিইরা পাইলাম।

-তারপর?

–তারপর জৌর টর্চ ফোকাস করতে করতে তাবুকে পাশ গেলাম, গিয়া দেখি হুজেীর, তাবু চেপ্টা, হ্যাজাক লাইটাটো ভাঙচুর অওর হামরা সাথী তিন কনেস্টবল,

রতন, স্বপন আরনয়ন চেপ্টাহইয়া মইরা আছে, বন্দুক ওন্দুক চ্যাপ্টা হইয়া ভাইঙ্গা গেছে। – সে দৃশ্য ভাবলে হুজৌর ভােয় পাইয়া যাইবেন। হামি ছুইটতে ছুটতে হাপনাকে আইসা ডাকলাম।

–তুমি বিশাম নাও, আর থানায় পাগলা ঘন্টি বাজাতে বল। — জী, হুজুর।

থানায় পাগলা ঘন্টি বাজানাে হলাে। বড় দারােগা, ছােট দারােগা আর জীপে তিনজন কনেস্টবল নিয়ে প্রথমেই হাজির হােলেন ডাক বাংলােতে।

পুলিশ সুপারকে ডেকে সব কথা বললেন। সদল বলে অকুস্থলে গিয়ে দেখলেন কনেষ্টবল রামভজন পাড়ে একটুও বাড়িয়ে বলেননি। | তাবু, মানুষ জন, সব কিছু চ্যাপ্টা, ভাঙচুর, রক্তাক্ত। লরির চাকার দাগও পরখ .. করা হােল, মাঠ মাঝ থেকে আর চাকার দাগের কোনাে হদিশ পাওয়া গেল না। তিন মৃত কনস্টেবলের চোখই ভয়ে বিস্ফারিত।

পরে থানায় স্থানীয় লােকজনকে ডেকে একটি সভা ডাকা হাে’ল, হেতমপুরের মাঠের ঘটনার ব্যাপারে আলােকপাত করা হােল।

| আলােচনার মাধ্যমে জানা গেল – এ পর্যন্ত হেতমপুরের যতগুলাে লােকই এভাবে মারা গেছে—তারা মারা গেছেশনিবার কিংবা মঙ্গলবার রাতে। হয় সন্ধ্যা রাতে অথবা রাত বারােটার কাছাকাছি সময়ে।

. হেতমপুরের সবচেয়ে বৃদ্ধ ব্যক্তি পাঁচু মণ্ডলের বাবা তারু মণ্ডল বলল ঃ হুজৌর গুলি বন্দুক দিয়ে হেতমপুরের মাঠের এ ঘটনা বন্ধ করা যাবে না।

পুলিশ সুপার ও কেন? -এটা হলাে গিয়ে হুজুর তেনাদের ব্যাপার। – তেনাদের মানে? —ভূতেদের। এবং তেনাদের গুলি-গােলা দিয়ে শায়েস্তা করা যাবেনা। -তবে?

— অনেক কালের একটা ঘটনা বলছি হুজুর তাহলেই সব ব্যাপার আপনার কাছে খােলসা হয়ে যাবে।

— বলুন।

- আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে হেতমপুরের পাশের সদানন্দ মণ্ডল বলে একজন ড্রাইভার, সেলরি চালাত। একদিন শনিবার রাতে ব্রেক ফেল হওয়ায় মাঠের মধ্যে নেমে আসে। হেতমপুরের মাঠটা ছিল ডাকাতদের আড্ডাখানা।

-তারপর? – লরি ব্রেক ফেল করায়, সদানন্দ মণ্ডল তাে লরি বােঝাই মালপত্র নিয়ে

হেতমপুরের মাঠেনামল, তখন ডাকাতরা তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলল, অর্থাৎনৃশংশভাবে খুন করল। লরি বােঝাই মালপত্র লুটপাট করে লরিটা ভেঙেচুরে কোথায় যে গায়েব করল কে জানে? তখন হেতমপুরে থানা হয়নি।

-তারপর? : তারপর থেকে প্রতি শনিবার ও মঙ্গলবার রাতে হেতমপুরের মাঠে ঐ লরির আবির্ভাব এবং মাঠে যদি ঐ সময় কেউ এসে পড়ে, সে আর প্রাণে বাঁচে না। তিরিশ বছর । ধরে ভূতুড়ে লরির সেই একই খেলা চলছে। পুলিশ সুপার জিজ্ঞেস করলেন ঃ এর বিহিত কি করে করা যায় মণ্ডল মশাই?

- আমার তাে মনে হয় সরকারী তরফ থেকে অথবা জনসাধারণের তরফ থেকে কেউ যদি গয়ায় সদানন্দ মণ্ডলের নামে পিণ্ডি দিয়ে আসে তবে এই ভূতুড়ে লরীর উৎপাত বন্ধ হতে পারে। নতুবা এই ভূতুড়ে লরির উৎপাত বন্ধ করা সম্ভব হবে

না।

সব কথা শুনে পুলিশ সুপার বলল ঃ বেশ আমরা পুলিশের তরফ থেকেই সদানন্দ মন্ডলের নামে গয়ায় পিণ্ডদানের ব্যবস্থা করছি।

তারপরের ঘটনা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত, পুলিসের পক্ষ থেকে থানার ছােট দারােগা এবং মৃত সদানন্দ মণ্ডলের একজন বংশধর গয়ায় গিয়ে সদনন্দ মণ্ডলের নামে পিণ্ডদান করেন।।

| এবং বলা বাহুল্য – পিণ্ড দানের পর থেকেই হেতমপুরের মাঠে আর কোনাে রাতে ভূতুড়ে লরির একবারও উৎপাত হয়নি। | ভূতুড়ে লরির চাকার দাগও হেতমপুরের মাঠে আর কখনও দেখা যায় নি।


Author : শম্ভুনাথ বণিক
Date : 2019-07-13 07:24:00

-: advertisement :-

-: advertisement :-

-: advertisement :-

-: advertisement :-

-: advertisement :-

-:Advertisement:-