-: advertisement :-

বাড়িতে ফেরার পথে ভূত


বহুদিন পরে বাড়িতে ফিরছি। কাজকর্মের ব্যাপারে এতদিন দেশের মায়া কাটিয়ে প্রবাসে থাকতে হয়েছিল — এবার, প্রবাসের চাকুরিতে ইস্তফা দিয়ে দেশের বাড়িতে ফিরছি।

| হাওড়া থেকে ট্রেনে কোলাঘাট। কোলাঘাট থেকে লঞ্চে করে যেতে হবে । গােপীগঞ্জের ঘাট - সেখান থেকে ৩/৪ মাইল পায়ে হেঁটে যেতে হবে সােনাখালি। .

একটানা বার বছর প্রবাসে কাটিয়েছি — কে জানে গ্রামের কত কি পাল্টে গেছে। লঞ্চটা ঠিক সময়ে ছাড়েনি। কারণ, বিকেল হয়ে গিয়েছিল। আর একটাই মাত্র লঞ্চ এ পথে। এক ছাড়া দ্বিতীয় নাস্তি। অতএব দেরিতে ছাড়লেও ঐ একটি লঞ্চ ই আমাদের ভরসা।। | লঞ্চ টা ছাড়তে দেরী হওয়ায় গােপীগঞ্জের ঘাটে গিয়ে পৌঁছল ঠিক সন্ধ্যের সময়। বর্ষাকাল আকাশ মেঘাচ্ছন্ন । যে-কোন মুহূর্তে বৃষ্টি শুরু হতে পারে।পথ-ঘাট শ্মশানের পাশ দিয়ে পৰ্থ। দু'একজন সঙ্গী পেলে মন্দ হতাে না। :

| কিন্তু সােনাখালি যাবার কেউ নেই। গঞ্জের দোকানে চা খেয়ে হাতের বােঝ কঁধে নিয়ে হাঁটতে শুরু করি। এছাড়া আর উপায় কী! এ তাে শহর নয় যে ট্রাম-বাস পাওয়া যাবে।

একা একাই হেঁটে চলেছি। একটু এগােতেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হ’ল। :

বৃষ্টির জন্য ভাবলে আর বাড়ি যাওয়া চলবে না। জামা কাপড় ভিজে যাক ক্ষতি | নেই। পথে নেমে — আবার গােপীগঞ্জে ফিরে যাবার কোন মানে হয় না। গঞ্জে কোন ভূত পেত্নীতে বিশ্বাস না করলেও, বয়স্ক লােকের কথা শােনা উচিত, তাই বাশটা ডিঙিয়ে পাশ কাটিয়ে চলি আমি।

বাঁশটার পাশ কাটিয়ে চলে আসতেই, ভদ্রলােক আমাকে বললেন, এবার পেছনে তাকিয়ে দেখ তাে ভাই!

সত্যি, পথের ওপরে আর বাঁশ নেই। বাঁশটা সােজা হয়ে উপরে উঠে গেছে। বাঁশঝাড় থেকে মেয়েলি কণ্ঠের খিল্ খিল হাসি আমি শুনতে পাই।

ভদ্রলােক বললেন, “ঐ শােন পেত্নীটা হাসছে। পেত্নীকে একদিন এমন মজা দেখাব যে কোনদিন আর পথের লােকদের বিপদে ফেলবে না। আজই দেখাতাম, তুমি সঙ্গে আছ— ভয় পেয়ে যাবে।”

ভূত-পেত্নীকে আমি কোনদিন বিশ্বাস করি না – কিন্তু আজ যা দেখলাম ও শুনলাম তা আমি হয়তাে কোনদিনই বুদ্ধি দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারব না।

কিছুক্ষণ পরেই ভৈরবপুরের শ্মশান এসে গেল। এই শ্মশানের কাছ দিয়ে দিনের বেলা যেতেই গা ছম ছম্ করে ওঠে। - বুড়াে ভদ্রলােক আগে আগে চলেছে, আমি পিছু পিছু। ব্যবধান খুব কম। কিন্তু এ কি! নিজের চোখকেই আমি বিশ্বাস করতে পারি না। আমার সামনে থেকে ভদ্রলােক যেন হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেছে।

আমি এদিক-ওদিক তাকাই। কিন্তু কোথাও তিনি নেই। তেঁতুলগাছের ডালে। বসে একটা পেঁচা বিশ্রী রকমভাবে ডাকছে। দূরে শিয়ালের চীৎকার। সব মিলিয়ে সে অদ্ভুত এক পরিস্থিতি।

| আমি প্রাণপণে চীৎকার করে উঠি : “জামাইবাবু, জামাইবাবু জামাইবাবু কোথায় গেলেন?”

| আমার ডাকার উত্তরে – শ্মশান থেকে বিকট অট্টহাসি ভেসে আসে। ভয়ে আমার শরীর কাঁটা দিয়ে ওঠে। শরীরের লােমগুলাে আতঙ্কে খাড়া হয়ে ওঠে।সর্বশরীরে শিহরণমূলক আতঙ্ক অনুভব করি।

আমি প্রাণপণে সামনের দিকে ছুটতে থাকি, কাদায় পা পিছলে বার পড়ে গেছি— আবার উঠেই ছুটতে থাকি।

কতক্ষণ ছুটেছি কে জানে। একটা বাড়ির পাশে এসে চীৎকার করে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাই।

অনেক পরে আমার জ্ঞান ফিরে আসে। সর্বাঙ্গ কাদায় মাখামাখি। যে বাড়ির সামনে এসে আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাই, সে বাড়িটা পদ্মগায়ের মােড়ল – বিশু পােদ্দারের। বিশু পােদ্দার আমার বাবার খুব পরিচিত। তিনি লণ্ঠনসহ একজন লােক আমার সাথে দেন। লােকটি আমাকে আমার বাড়ির দাওয়া পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসে।রাত তখন সাড়ে নটা। | মা আমাকে ঐভাবে দেখে অবাক হয়ে যান। চিাতে একটু কষ্ট হয় তার পঞ্চে।

মা অনুযােগ করেনঃ এতদিন পরে এলি। একটা-চিঠি পত্র দিয়ে বাড়ি আসতে হয়। তুই আসবি জানলে ভজকে না হয় গােপীগঞ্জে পাঠাতাম। কিন্তু তাের এ অবস্থা হলাে কি করে?

| মাকে সব কথা খুলে বলি। আমার সব কথা শুনে মা চোখ কপালে তুলে হে, যেন অবিশ্বাস্য কোন কথা বলেছি।

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মা বলেনঃ“বহুভাগ্যে বেঁচে এসেছিল।হরিপদ চঙ্কেত্তি। তার মেয়ে মনােরমা এখন পলাশপুরেই নেই। জামাই বহুদিন আগে কঠিন রােগে ভুগে অন্ধ হয়ে যায়। তারপর একদিন হার্টফেল করে মারা যায়।

: মার কথা শুনে আমি অবাক হয়ে যাই। প্রায় দু’মাইল পথ তবে কি আমি ঐ অঙ্গ ভূত-জামাইয়ের সঙ্গে এসেছিলাম? | তার সেই বিশ্রী রকমের বেশবাস, অদ্ভুত কণ্ঠস্বর আর অট্টহাসি – জুবলে বােধহয় কোনদিন ভুলতে পারব না। ভূত জামাই না হলে - বুড়াে বয়সে অতাে ক্ষিপ্রগতিতে ওই কর্দমাক্ত পথে – কোন মানুষের পক্ষেই চলা সম্ভব নয়।

তারপর ভৈরবপুরের শ্মশানের কাছাকাছি এসে হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যাওয়া। কেন | ভাবেই বুদ্ধি দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারি না।


Author : শম্ভুনাথ বনিক
Date : 2019-07-13 02:04:41

-: advertisement :-

-: advertisement :-

-: advertisement :-

-: advertisement :-

-: advertisement :-

-:Advertisement:-