-: advertisement :-

ভুতুড়ে বাড়ি


এক ফালি রূপপার পাতের মত সরু নদীটা এঁকেবেঁকে চলে গেছে দুরে । | বহুদূরে।

নদীটার পূর্ব পাড়ে হিরণপুর গাঁ। এই গাঁয়ে পঞ্চাশ ঘর লােকের বেশি বাস নয়। কিন্তু মাত্র একশাে বছর আগেও যে হিরণপুরের জনসংখ্যা অনেক বেশি ছিল এবং অনেক বেশি সমৃদ্ধশালী ছিল, তা বুঝতে পারা যায়কতকগুলাে পুরােনাে বড়বড় কোঠাবাড়ির ভগ্নাবশেষ দেখে।

| এমনি একটা পুরানাে বাড়ি হল রায়েদের বাগানবাড়ি। বাড়িটা দোতলা। ছােটখাট। সামনে নিচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা অনেকখানি পােড়াে জমি। সে-জমি কাটা ঝােপ আর আগাছার জঙ্গলে ভর্তি! আসলে রায়েদের ঐ জমিটাই বলা হত কম্পাউন্ড। | প্রায় নববই বছর আগে হিরণপুরে একবার ভীষণ কালাজ্বরের প্রকোপ দেখা দিয়েছিল। বহু লােক মারা পড়েছিল তাতে। বহু লােক গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছিল। যারা পালিয়েছিল, তারা আর ফিরে আসেনি। রায়েদের বাগানবাড়িটাও সেই থেকে এমনি নিঃসঙ্গ অবস্থায় পড়ে আছে। এই নববই বছরের মধ্যে এই বাড়িমুখাে-আর হয়নি কেউ। ঘন জঙ্গলে ঢেকে আছে সারা বাড়িটা। আজ আর চেনাই যায় না বাগানবাড়ি বলে। . প্রায় আশি বছর আগেকার কথা। গ্রীষ্মকালের এক নিশুতি রাতে গাঁয়ের রাখাল ভট্টাচার্য গরমের জ্বালায় অস্থির হয়ে বিছানা-টিছানা ছেড়ে তাঁর বাড়ির বাইরের মাটির দাওয়ায় বসেহঁকো টানছিলেন।রায়েদের বাগানবাড়িটা তার বাড়ির প্রায় সামনা-সামনিই –কিছুটা তফাতে।হঠাৎ তার কানে এল বিকট অট্টহাসির শব্দ।হাসিটা যে বাগানবাড়ি

থেকেই ভেসে এল, সে ব্যাপারে তার কোন সন্দেহ রইল না।

কথাটারটে তোলা হু-হু করে। সারা হিরণপুরের অধিবাসীরা তৎক্ষণাৎ নিঃসংশয়ে মেনে নিল যে, হ্যা, ঐ বাগানবাড়িতে ভূতই আছে। কিন্তু একটা জোয়ান ছেলে,নাম তার গােপেন, সে তাচ্ছিল্যভরে বলে উঠল ;ই। যতসব গাঁজাখুরি কথা।ভূত না ছাই! রাখাল জ্যেঠা হুঁকোর নেশায় বুদ হয়ে.... | কিন্তু পরদিন রাতে গােপেনও যখন শুনল সেই হাসির শব্দ,তখন আর তার মুখ . দিয়ে কোন কথা বার হল না। এরপর অনেকেই রাত জেগে শুনল হাসির আওয়াজ.... কেউ কেউ আবার কান্নার আওয়াজও পেল। কে যেন করুণ সুরেকঁদে। কী এক গভীর ব্যথা-বেদনা মেশানেনা সে কান্নায়।

সারা হিরণপুরের লােকের আর কোন সন্দেহই রইল না। গােপেনের মত আর কেউ | কখনাে বিদ্রুপ করে বলেনি যে, যতসব গাঁজাখুরি কথা! অমুক জ্যেঠা হুঁকো বা গাঁজার। | নেশায় ঝুঁদ হয়ে.....

তারপর থেকে ঐ বাগানবাড়ির ত্রি-সীমানাতেও আর কেউ যায় না। প্রখর দিনের আলােয় ও-বাড়ির আশপাশের পথ দিয়ে অনেকেযাতায়াত করলেও সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসবার অনেক আগে থেকেই ও-দিকটা জনবিরল হয়ে আসতাে। ঠিক এইরকম ভাবেই চলে আসছিল সুদীর্ঘ আশিটা বছর ধরে।

আশি বছর পর আজ আবার ঐ ব্যাপারটা নিয়ে চাঞ্চল্য জেগেছেহিরণপুর গ্রামে।

হিরণপুরের সুরেশ চক্রবর্তীর ছেলে অজয় কোলকাতায় থেকে কলেজে পড়াশুনাে করে। তারই এক বন্ধু শ্যামাপদ একদিন কথায় কথায় অজয়ের কাছ থেকে জানতে পারে রায়েদের বাগানবাড়ির ভৌতিক ব্যাপারটা।বরানগরের ময়রাডাঙ্গা রােডে শ্যামাপদ থাকে। সকলে তাকেশ্যামা বলেই ডাকে। খেয়েদেয়ে,গল্পের বই পড়ে, খেলাধুলােকরে,বন্ধুমহলে আড্ডা দিয়ে বেশ মজাসে দিন কাটায়। এসব ছাড়াও ওর আরও একটা মন আছে। সেমন হল অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় মন। যদি কোথাও কোন রহস্যের ইঙ্গিত সে পায়, অমনি ছুটে যাবে সেই রহস্যের পিছনে। সেই রহস্যের সমাধান না করা পর্যন্ত তার শাস্তি হয় না। তাই হিরণপুরের বাগানবাড়ির কথা শুনে সে ঠিক করল, হিরণপুরে পাড়ি জমিয়ে ঐ ভূতের সঙ্গে মােলাকাত করে আসবে। | অজয় তাকে বারবার সাবধান করল, বেশ ভাল করে বিবেচনা করে দ্যাখ, এ,

কিন্তু মােটেই তামাশার ব্যাপার নয়। যা বলছি তা অতি সত্যি। সেই হাসির শব্দ আমি = নিজের কানে শুনেছি।

শ্যামা হাসি-হাসি মুখে বলল, আমি তাে বলছিনে তাের কথা মিথ্যে। ভূতের = কথা, ভূতের গল্প শুনে আসছি, সেই ছােট্টবেলা থেকে। জীবটিকে দেখার ইচ্ছে আমার

বাহুদিনে। তাই আমি হিরণপুরে যেতে চাই।

অযু আর শ্যামার আরেক বন্ধু শ্যামল। শ্যামলও শ্যামার চরিত্রের ছেলে. অ্যাডভেম্রাবের গল্প পেলে তারও মন চঞ্চল হয়ে ওঠে।শ্যামা গিয়ে শ্যামলকে বলল, হিরে যাওয়ার কথা। শুনে শ্যামলও লাফিয়ে উঠল। সে-ও যাবে তার সঙ্গে।ভূতে সাজ দেখাসাক্ষাৎ করার ইচ্ছে তারও প্রবল।

শ্যামাপদ আর শ্যামল — হিরণপুরে এদের আসার উদ্দেশ্যটা কি, তা জানতে জোরে বহুকাল পর আবার গ্রামবাসীদের মধ্যে চাঞ্চল্য জেগেছে। প্রবীণ ব্যক্তিরা অনেকেই যে ওদের নিষেধ করলেন এবং এ ব্যাপারে অগ্রসর হতে বারবার নিরস্ত হতে বললেন। অল্পদিকে কয়েকজন ডানপিটে গােছের ছেলে বেশ উৎসাহিত হয়ে উঠল। জামার আন্দ্রিলা গুটিয়ে কেউ বলল, কাজ কি বাড়িটা ওখানে রেখে? আমরা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেব বভিটা! মাঠ তৈরী করে আলুর চাষ করবাে ওখানে।

প্রবীণ ব্যক্তিরা বললেন, কাজ কি বাবা এসব নিয়ে হৈ-হাঙ্গামা করার? যেমন আছে থাক। ওঁনারা তাে কোন ক্ষতি করছেন না আমানের?

মেয়েরা তাে চোখ বড় বড় করে সভয়ে কপালে হাত ঠেকিয়ে বলল, না, না, লা, মানে ও ওসব কথা স্থান দিও না বাছারা! ওঁনারা স্বয়ং ব্রেহ্ম দত্যি! ওঁদের কোপে ভিলে রক্ষে নেই!

একজন বুড়ি বলল, আহা বাছারা, তােমরা অজয়ের বন্ধু, কোলকাতা থেকে বেড়াতে এসেছে - খাও-দাও, ঘুরে বেড়াও – দু'দিন আনন্দ করে ঘরের ছেলে আবার ঘরে ফিরে যাও। কেন শুধু শুধু উটকো বিপদ ঘাড়ে চাপাতে চাইছাে ! কি থেকে কি হয় বলা যায়। শেষটায় প্রাণ নিয়ে টানাটানি না পড়ে! ও বাড়ির দিকে পা বাড়িও না বাবা ! ওরে অজয়, আমি বলি কি শােন, তােরা রং গাঁয়ের সকলে মিলে জোড়া পাঁঠা দিয়ে ওদের একটা পূজো দেওয়ার ব্যবস্থা কর, তাতেওঁরা সন্তুষ্ট হয়ে ওবাড়ি ছেড়ে চলে গেলেও যেতে পারেন!

| অজয় বলল, তুমি হাসালে জ্যেঠাইমা,ভূত-প্রেত-শাকচুন্নিতে কি পাঁঠা খায় যে পঠা দিয়ে পূজো দেব!

| এত জনের কাছ থেকে নিষেধ এবং নানা ভয়ের কথা শােনা সত্ত্বেও শ্যামল আর শমা নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল রইল। তারা ঠিক করল, আজকের দিনটা থাক, কাল রাতে তারা যাবে ভূতের বাড়িতে। ওদের সঙ্গে অজয়ের যাবার ইচ্ছা তেমন নয়। কারণ সে ভীতু প্রকৃতির ছেলে—আর সেকথা শ্যামা আর শ্যামলেরও অজানা ছিল না। অজয় মুখে দু-এবার যাব যাব’ বললেও সেবলাটা মােটেই আন্তরিক ছিল না। তার ওপর অজয়কে

ছেড়ে দিতে ওর মা-বাবারও আপত্তি। সেসব বুঝেই শ্যামল বলল,নারে আমাদের সঙ্গে তাের যাবার দরকার নেই -তুই যা ভীতু, গিয়ে একটা চ্যাপা বাঁধিয়ে গুলি। তাের কোন চিন্তা নেই – দেখবি আমরা ঠিক ফিরে আসবাে। এতে তাদের শােনা,কি হল

হল। | পরদিন সকালে চা-বিস্কুট খেয়ে অজয় দুই বন্ধুকে গ্রাম দেখাতের হল।প্রথমেই তারা গেল রায়েদের বাগানবাড়ির দিকে। বাড়িটার চারদিকে ঘুরে 'ভাল করে দেখে নিল। তারপর গ্রামের পাঠশালা, খেলার মাঠ,শিবমন্দির,কালীমন্দির, মা শীতলারপন,স্কাপের পাতের মত সিধাই নদী -এসব দেখতে খুব বেশি সময় লাগল না। কারণ গ্রামের আকার তেমন বড় নয় বরং দেখতে গেলে ছােটই। অল্প জায়গার মধ্যেই সবকিছু রয়েছে। ঘন্টা দুয়েকের মধ্যেই সব দেখেশুনে তারা বাড়ি ফিরে এল। কদিও ঐক্য জিনিস দেখতে তাদের দু'ঘন্টা সময় লাগেনি – কিন্তু চলার পথে এর-ওর সঙ্গে কথা বলা, এর-ওর সঙ্গে বন্ধুদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া – এতেও খানিক সময় গেছে। | বাড়ি ফিরে পরােটা, আলু চচ্চড়ি, ঘরের গরুর দুধ থেকে তৈরী হুনার সন্দেশ দিয়ে তিনজনের ভালই জলযােগ সারা হল। তারপর বসল ব্যারন নিয়ে স্বরানে তারা এমনই মশগুল হয়ে পড়ল যে, বারােটা বেজে গেল, তবু তাদের নেই। অজরে না এসে তাদের জোর করে তুলে দিলেন – কিরে, ক্যারান নিয়ে বসে থাকলেই পের্টির খিদে মিটবে? বারােটা কখন বেজে গেছে— চানও করতে হবে না, খেতেও হবে না, কেমন ? উঠে পড়, চান করে আয় – আমার রান্না খেন শেষ হয়ে গেছে।

অজয় বলল, মা, আর একটু সবুর কর, এই গেমটা শেষ হে... , মা বললেন, না, আর শেষ হতে হবে না,উঠে পড়–বলেই তিনি খুঁটিগুলো হাত দিয়ে এলােমেলাে করে দিলেন।

| তিনজনে তখন হাসতে হাসতে, হৈ-হৈাতেকরতে উঠে পড়ল। রাত সাড়েনটা নাগাদ খাওয়া-দাওয়া শেষ করে শ্যামল আর শ্যামা দুজনে গেট পেরিয়ে রায়েদের বাগানবাড়ির মধ্যে ঢুকলাে। দুজনের কাছেই পাঁচসেলের দুটো টর্চা শ্যামার কাছে আরও একটা জিনিস রয়েছে। সেটা একটা রিভলবার। অস্ত্রটা কোলকাতারই এক বিশেষ জানাশােনা লােকের কাছ থেকে চেয়ে এনেছে।।

বাড়িটায় মােট পাঁচখানা ঘর। দ্ভিচে তিনখানা, ওপরে দু'খানা নিচের তিনখানা ঘরের মধ্যে একখানা ঘর লম্বায় চওড়ায় বেশ বড়। ঘর না বলে সেটাকে হলঘর বলাই ভাল।বড়লােকের বাগানবাড়ি যখন,মনে হয় এই ঘরটাতেই গানবাজনার আসর বসতাে।

প্রথমেই ওরা ওপর-নিচের সব ঘগুলাে একবার ঘুরে দেখে নিল। জানলাদরজাগুলাে উইপােকায় সব নষ্ট করে ফেলেছে। কড়িরগাতেও উই ধরেছে। তার

ওপরনব্বই বছরের জমে-ওঠা বাইরের ধুলােবালি, দেওয়াল থেকে খসে পড়াচুবালি, বাইরে থেকেউড়ে-আসা শুকনাে গাছের পাতা ইত্যাদিতে মেঝেগুলাের যা অবস্থা হয়েছে, ভূত না থাকলেও, দেখে ভূতুড়ে বাড়ি বলেই মনে হয়।

কম্পাউন্ড থেকে দুটো বনতুলসির গাছ উপড়ে এনে নিচের তলারই একখানা ঘর মােটামুটি পরিষ্কার করে নিয়ে তারা মাদুর বিছিয়ে বসল। শ্যামল বলল, বাড়ির দুগ্ধফেননিভ সুকোমল শয্যার সুখটা আজকের রাতে এই নােংরা পােড়ােবাড়ির ঘরে

মাদুরের ওপরে শুয়েই মিটিয়ে নিতে হবে? .: শ্যামা মাদুরের ওপর দেহটা এলিয়ে দিয়ে বলল, সবই বিধির লিখন। | রাত যত বাড়তে লাগল, তাদের কথাবার্তা বলাটাও তত কমে আসতে লাগল। খুব কমই তারা কথা কইতে লাগল, আর যেটুকু কইতে লাগল, তা খুবই মৃদুস্বরে – ফিসফিস করে।

| নিঝঝুম বাগানবাড়ি। মশার ভদ্ভানি আর ঝিঝি পােকার অশ্রান্তঅসহ্য চিৎকারে ক্রমশই ওরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠতে লাগল। মাঝে মাঝে শিয়ালেরষ্কাহুয়া,কখনন কুকুরের ঘেউ ঘেউ ডাক, কখনাে পাচা-বাদুড় ইত্যাদি নিশাচর পাখিদের তীক্ষ্ণ চিৎকার —সব মিলিয়ে বেশ একটা রােমাঞ্চকর আবহাওয়ার সৃষ্টি হয়েছে।

মাঝে মাঝে ওরা হাতঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিল। একসময় দেখল, রাত বারােটা বেজে দশমিনিট হয়েছে। এরই অল্প কিছুক্ষণ পর পাশের ঘরে খখশব্দ হতে দু'জনে সচকিত হয়ে উঠল। কান তাদের অতিমাত্রায় খাড়া হয়ে উঠল। একটু মনােযােগীহতেই বুঝতে পারল,শব্দটা পায়ে চলার শব্দ। এত রাতে আবার কে এসে ঢুকলাে ও ঘরে?

শ্যামল রসিকতা করে বলল, ভূত নাকি রে? শ্যামা বলল, তাের মুণ্ডু!

– ভূত বা মুণ্ডু যাই হােক, ব্যাপারটা তাে দেখতে হবে। এত রাতে এই। পােড়ােবাড়ির ঘরে কে এসে ঢুকলাে?

-হ্যা দেখতে তাে হবেই। খুব পা টিপে টিপে আয়, খুব সাবধানে শব্দ। | যেন না হয়।

দু’জনে টর্চ নিয়ে উঠল। শ্যামার বাঁহাতে টর্চ, ডানহাতে রিভলবার।

বারান্দায় বেরিয়ে পাশের ঘরের দিকে তাকাতেই আশ্চর্য হয়ে গেল তারা। ঘরটার | মধ্যে মৃদু আলাে জ্বলছে। দরজার ধারে গিয়ে উঁকি মেরে দেখল, ঘরের মেঝের ওপর একটা লণ্ঠন টিটি করে জ্বলছে, আর একটা বুড়ােলােক কিছু শুকনাে পাতা আর কাঠিমুটি জড়াে করছে। সেখানে দু'-তিনটে ইট বসিয়ে একটা উনুন তৈরী করা হয়েছে, আর ঐ উনুনের ওপর বহুদিনের পুরনাে একটা কালিমাখা নােংরাহাঁড়ি বসানাে রয়েছে।

শ্যামাআর শ্যামল বুঝল, বুড়ােটা কিছুরাধবার জোগাড় করছে। এবং এটাও ওরা অনুমান করে নিল যে, বুড়ােটা ভিখিরি-টিকিরি কেউ হবে—এখানেই রাতে রাঁধে, খায়, থাকে। ভাের হলে বােধহয় বেরিয়ে যায় আবার।

কিন্তু এত রাতে রান্নারআয়ােজন কেন?হয়ত কোন দূর গ্রামে ভিক্ষায় গিয়েছিল, এইমাত্র ফিরে এসেছে। | শ্যামা আর শ্যামল আর বাইরে থেকেঢুকে পড়ল ঘরের মধ্যে। মানুষেরশব্দ পেয়ে বুড়ােটাও অমনি চকিতে ফিরে তাকাল। ইস, কী ভয়ানক রােগা লােক! হাড়চামড়া ছাড়া তার শরীরে আর কিছু নেই। দেহে প্রাণ আছে বলেও মনে হয় না। দেহে প্রাণ নেই মনে হলেও, তার কোটরগত চোখ দুটো অস্বাভাবিক রকমের উজ্জ্বল — লণ্ঠনের আলাে লেগে যেন আগুনের মত জ্বলছে। । | দেখে ওরা বড়ই অস্বস্তি বােধ করতে লাগল। যেন বুড়ােটার সামনে থেকে পালাতে পারলে বাঁচে।বুড়ােটাও যেন কী! জ্বলন্ত চোখে চেয়েই রয়েছেওদের দিকে অপলক চেয়েই রয়েছে। * শ্যামূল হঠাৎ বেপরােয়া হয়ে বলে উঠল, অমন করে তাকিয়ে রয়েছে কেন? কে তুমি? এখানে কি করছাে?

বুড়াে বিদঘুটে ভাবে হেসে উঠল। কী বিশ্রী সে হাসি! খ্যাখ্যা করে হাসতেই থাকল খানিক্ষণ। তারপর বলল, খােকাবাবুদের ভয় করছে বুঝি?

শ্যামা বলল, ভয় করবে কেন? তুমি তাে আর বাঘ-ভাল্লুকনও! তুমিও মানুষ, | আমরাও মানুষ!

—আমিও মানুষ, তােমরাও মানুষ!-শ্যামার কথাটার পুনরাবৃত্তি করে বুড়ােটা এবার হ্যা হ্যা করে এমন জোরে হেসে উঠল, সে হাসির শব্দ বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ল। এ হাসি সাধারণ হাসি নয় –এ হাসি যে কী ধরনের তা বলা যাবে না।

ওরা দু'জনে বেশি রকমের চমকে উঠল। আর এই চমকানির মধ্যে ভয়ও ছিল অনেকটা।

| হাসি থামিয়ে বুড়াে বলল, তােমরা বসাে, আমি ততক্ষণে রান্নার জোগাড়টা করে নিই।তারপর তােমাদের সঙ্গে সারারাত ধরে গল্প করবাে। কতদিন যে মানুষের সঙ্গে কথা বলিনি!না না, দিন নয় -কত বছর কয়েকটা যুগ!

শ্যামল বলল, কি বলছাে পাগলের মত?

বুড়ো আবার তেমনই পার্থিব হাসি হেসে বলল, তােমাদের কথাগুলাে শুনতে বেশ লাগছে। বয়স অল্প কিনা, পৃথিবীর অনেক কিছুই জান না তােমরা। তাই তোমাজে বােকা বােকা কথাগুলো শুনতে বেশ লাগছে আমার।।

| শ্যামাপদর সর্বশরীর বাগে রী-রী করে উঠল বুড়াের কথা শুনে।কিন্তু কোনরকম রাগ প্রকাশ না করে অন্য কথা বলল, তা এত রাতে রান্না কেন? কোথায় ছিলে এতরুণ, তুমি কি এ বাড়িতেই থাকো?

. এসব কথার কোন জবাব না দিয়ে বুড়াে উনুনের মধ্যে কাঠকুটো দিতে লাগল। শ্যামল আর শ্যামাও আর কোন কথা না বলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। তাদের কেমন একটা ভয়-ভয়, কেমন যেন অস্বস্তি বােধ হতে লাগল।

একটু পর বুড়ো বলল, তােমরা দাঁড়িয়ে রইলে কেন, বসাে বসে। ঘরটা বড় নােংরা না? ঝাড়ুও তো নেই।

— আচ্ছা আমি ব্যবস্থা করছি।

বলে শ্যামল পাশের ঘর থেকে বনতুলসি গাছ দু’টো আর মাদুরটা নিয়ে এল। খানিকটা জায়গা পরিষ্কার করে নিয়ে মাদুর বিছিয়ে বসল। বুড়ােটাও ততক্ষণে উনুন জ্বেলে দিয়েছে। উনুনের ওপর হাঁড়িটা যেমন বসানাে ছিল, তেমনই রইল।।

শ্যামল বুড়ােকে জিজ্ঞেস করল, হাঁড়িতে কি আছে? কোন জবাব না দিয়ে বুড়াে ওদের দিকে পিটপিট করে চেয়ে চেয়ে হাসতে লাগল। – পাগল!-শ্যামার কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে শ্যামল বলল। —তাইতাে মনে হচ্ছে।

সংক্ষেপে জবাব দিল শ্যামা। তারপর বুড়ােকে জিজ্ঞেস করল, তােমার দেশ কোথায়?

বুড়াে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর না দিয়ে কয়েক মুহূর্ত নিশ্চপরইল। তারপর বলল, এটাই আমার দেশ, এই হিরণপুর।

– তােমার নিজের বাড়িঘর কিছু নেই। –আছে বৈকি! আগে চালাঘর ছিল, এখন কোঠাবাড়ি হয়েছে। —তবে সেখানেনা থেকে এই বনজঙ্গলের মধ্যে পােড়ােবাড়িতে রয়েছে কেন? বুড়াে বেশ গম্ভীর হয়ে বলল, শুনবে সেকথা?

কন।

—শুনবাে বৈকি। বল।। বুড়াে তাদের যা গল্প শােনাল, তা সংক্ষেপে এইরকমঃ

এই যেখানে আজ রায়েদের এই পােড়ােবাড়িটা রয়েছে, বহুদিন আগে এখানে ছিল বাঁশবন, বেতরন, বুনাে লতাগুল্মের ঝােপঝাড়, আর তারই পাশে ছিল শ্রীদাম মাঝির কুঁড়েঘর। লােকে তাকে ‘ছিদাম’বলতাে। কেউ কেউ বা তাকে মাঝির পাে’বলে ডাকতাে৷ পরের জমিতে লাঙল দেওয়া, ধান রােয়া, ধান কাটা – এই ছিল তার পেশা। তাতেই কোনরকমে নিজের এবং তার ছােট্ট নতুন বৌটার ভরণপােষণ চলে যেত।।

এরপর একদিন কোলকাতা থেকে রায়দের মেজকর্তা হরিশঙ্কর রায় হিরণপুর এসে হাজির হলেন বাগানবাড়ির জন্য জমি দেখতে। অনেক দেখেশুনে এই জমিটাই তার পছন্দ হল। কিন্তু ছিদাম মাঝির ঘরটা বাদ দিয়ে কেবলমাত্র বাঁশঝাড় আর বেতবন কিনলে জমিটার আকার বা চেহারা বড় বেখাপ্পা হয়ে যায় — বাগান এবং বাড়ি তৈরী করলে একটা কোণ ভাঙা হয়ে থাকবে বাগান এবং বাড়ির সৌন্দর্য তাতে নষ্ট হবে। তাছাড়া অন্য দিক দিয়ে বিচার করলেও অমন একটা বিলাসভবনের পাশে অমন একটা হতশ্রী জীর্ণকুঁড়েঘর নিটোল সুশ্রী শরীরের ওপর ঠিক একটা দুষ্টব্রণের মতই মনে হবে।

| তাই হরিশঙ্করবাবু প্রথমে শ্রীদামের কাছেই গেলেন এর একটা মীমাংসা করবার জন্যে। তিনি প্রস্তাব করলেন যে, ছিদাম কুঁড়েটা তাকে দিয়ে দিক, পরিবর্তে মূল্যস্বরূপ টাকা নিলেও সে নিতে পারে, কিংবা হরিশঙ্করবাবু কাছাকাছি একটুকরাে জমি কিনে ঐরকম একটা কুঁড়েঘরও বানিয়ে দিতে পারেন। এখন শ্রীদামের যা অভিরুচি!

| এতে আপত্তি করার তেমন কিছু না থাকলেও শ্রীদাম এই আপত্তি জানাল যে, সে তার বাপ-ঠাকুর্দার ভিটে ছেড়ে অন্য কোথাও যাবে না। এরপরও তাকে নানাভাবে বােঝবার চেষ্টা করতে লাগলেন হরিশঙ্কর রায়। কিন্তু শ্রীদামের ঐ এক কথা। এখানকার মাটি সে কিছুতেই ছাড়বে না।

শ্রীদামকে বােঝাবার জন্যে গ্রামের দু’-একজন মাতববর শ্রেণীর লােককেও হরিশঙ্করবাবুসঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। শ্রীদামের একগুঁয়েমি দেখে একজন মাতববর বলে উঠলেন, দেখ ছিদাম, এতক্ষণ তাের পায়ে যথেষ্ট ভাল কথা বলে তেল দেওয়া গেল, তবুও যখন আমাদের কথা রাখলিনে, তখন তাের কপালে নিতান্তই দুঃখু আছে বুঝতে পারছি!

এই কথা শুনে শ্রীদাম মাঝির চোখ দুটো শুধু একবার দপ করে জ্বলে উঠেছিল, | কিন্তু করবার কিছুই ছিল না।

| ছিদাম উঠে গেল ঘর ছেড়ে দিয়ে। হরিশঙ্করবাবু খানিকটা তফাতে তার জন্য নতুন কুঁড়ে তৈরী করে দিলেন। আর এদিকে দেখতে দেখতে শ্রীদামের বাপ-ঠাকুর্দার ভিটের ওপর গড়ে উঠল হরিশঙ্কর রায়ের বিলাস ভবন।

এর বেশ কয়েক বছর পরে হিরণপুরে কালাজ্বরের মড়ক শুরু হয়। গাঁয়ের বহুলােক তাতে মরলাে – ছিদাম মাঝিও মারা গেল, তার বৌও মরলাে।

এই পর্যন্ত বলে বুড়াে একবার থামল। শ্যামল আর শ্যামা শুনতে শুনতে এতই। তন্ময় হয়ে পড়েছিল যে, বুড়াে থামতেই বলে উঠল -তারপর?

-তারপর?

বুড়াে একটু হাসল। হেসে বলল, ছিদাম মাঝি মারা গেল বটে, কিন্তু সেভুলতে পারলনা তার বাপ-ঠাকুর্দার ভিটেকে। তাই রায়েরা চলে যেতেই সে এসে আবার আঁকড়ে ধরল তার পুরনাে ভিটেকে। আমরা এখন যেখানে বসে রয়েছি, ঠিক এই জায়গাতেই ছিল তাঁর কুঁড়েটা।

হঠাৎবাইরের দিকে চেয়ে বুড়াে কেমন যেন চঞ্চল হয়ে উঠল।বলল, আরনয়, চলি, আমার যাবার সময় হয়ে এসেছে।


Author : তারা কুমার ভট্টাচারিয়া
Date : 2019-07-13 13:48:01

-: advertisement :-

-: advertisement :-

-: advertisement :-

-: advertisement :-

-: advertisement :-

-:Advertisement:-