-: advertisement :-

ভুতের বিয়ের খাওয়া দাওয়া


সন্ধ্যে সাতটা হবে। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছে। গ্রামের চণ্ডীমণ্ডপে আমরা সরাই জমায়েত হয়েছি। চণ্ডীমণ্ডপ আমাদের আড্ডাখানা। সাধারণতঃ আমরা তাস-পাশা খেলেই সময় কাটাই।আমি গাঁয়ের স্কুলের মাস্টার হয়ে নূতন এসেছি। পরিবারের লােকজন সব কোলকাতার বাসা-বাড়িতে রয়েছে। দিনের বেলা স্কুল আর ছাত্র ঠেঙিয়ে কোনরকমে কেটে যায় বটে, কিন্তু রাতের বেলা কিছুতেই কাটতে চায় না। তাই সন্ধ্যের পর আমরা চার-পাঁচজন চণ্ডীমণ্ডপে জমায়েত হয়ে নানা গল্প-গুজবে, খেলাধূলায় কাটিয়ে দিই। | আমার আস্তানাটা চণ্ডীমণ্ডপের পাশাপাশি। বাইরের লােক বলতে আমি একা। অন্যান্য শিক্ষকেরা সকলেই স্থানীয় লােক। দু'চার গ্রাম এদিক-ওদিক থাকেন। স্কুল ছুটির পর তারা যে যার বাড়িতে চলে যান। তাই আমাকে বাধ্য হয়েই সময় কাটানাের জন্যই চণ্ডীমণ্ডপে আড্ডা জমাতে হয়।।

| গ্রামের এই চণ্ডীমণ্ডগে সন্ধ্যার পর আমার মতাে আরও অনেকেই এসে জমায়েত হন। যাঁরা আসেন তারা সকলেই গ্রামের ব্যক্তি, মাতববর গােছের লােক।

| সেদিন গাঁয়ের মােড়ল হারু চক্কোত্তি বললেন, “আজ আর খেলাধূলা করতে ভাল লাগছেনা – আসুন গল্প-সক্স করা যাক।”

আমরা সকলেই একবাক্যে হারু চক্কোত্তির প্রস্তাবটি মেনে নিলাম।

হুঁকো টানতে টানতে তারিণী ঘােষাল প্রশ্ন করলেন, “আচ্ছা আপনারা কেউ বিয়ের নিমন্ত্রণ খেয়েছেন, মানে বিয়ে বাড়িতে ভােজ খেয়েছেন?”

এ তাে সাধারণ প্রশ্ন। বিয়ে বাড়ির ভােজ আমরা সকলেই খেয়েছি।

"বিয়ে বাড়িতে সকলেই খেয়েছে – তা আমি অনুমান করতে পারি। কিন্তু আপনারা ৯ি কেউ ভূতের বাড়ির বিয়ের নেমতন্ন খেয়েছেন? | ৩রণ বুড়াের প্রশ্ন শুনে আমরা সকলেই পরস্পরের মুকের দিকে তাকাই। নই নীরব। সকলের হয়ে আমিই জবাব দিই: "আমাদের তাে মনে হয় না ।

* ৭। কারাে ভূতের বিয়ে বাড়ির ভােজ খাওয়ার মতাে সৌভাগ্য হয়েছে। | জং উ. কাশতে কাশতে বলেন, “ আমার কি একবার সে সৌভা হয়ে।জানি আপনাদের পক্ষে এ ধরনের কথা বিশ্বাস করা সম্ভব নয়। তা অবিশ্বাস্য হলেও ব্যাপারটা সত্যি।”

আমরা অবাক হয়ে যাই। তারিণী বুড়াে এমনিতেই কথা খুব কম বলেন, তাছাড়া আজেবাজে কথা একদম বলেন না। | আমাদের হয়ে হার- চকোত্তি বলেন, “যদিও ভূত-ফুতে আমরা কেউ বিশ্বাস করি না, বুও আপনি যখন বললে – ব্যাপারটা আজগুবি বলে ভাবতে পারি না — ঠিক আহে, আপনি আপনার অভিজ্ঞতার কথা আজকের আসরে পরিবেশন করুন। | তারিণী বুড়াের সেই অভিজ্ঞতার কথা বলতে শুরু করেন ঃ “বহুদিন আগের

থা! তখন আমি যুক্ত। খুব বেপরােয়া ছিলাম। ভয়’ বলতে কিছু জানতাম না। রাতবিয়েতে একা একাই এখানে সেখানে ঘুরে বেড়াতাম।

একদিন একটি বিয়ের নেমতন্নর চিঠি পেলাম । আমার এক বন্ধুর দাদার বিয়ে। অনেককাল আগে বন্ধুর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলেও, পত্রযােগে আমাদের মধ্যে মিতালী ছি নিমন্ত্রণ পত্র ছাড়াও বন্ধু লিখেছিল ঃ যেহেতু বিয়ে বাড়ি আমাদের পাঁচ-ছয় মাইলের মধ্যে—আমি যদি কোলকাতায় গিয়ে বানুগমননা ত্রতে পারি—তবে যেন যথাসময়ে বিয়ে বাড়িতে উপস্থিত হই! তার একান্ত ও বিশেষ অনুরােধ।

কোলকাতায় গিয়ে রানুগমন করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়, আর তাছাড়া বিয়ে বাড়ি যখন আমাদের গ্রাম থেকে পাঁচ-সাত মাইলের মধ্যে — তখন বিয়ে বাড়িতে উপস্থিত হওয়াই আমার পক্ষে সুবিধাজনক। | কিন্তু বিয়ের চিঠিখানি আমি হারিয়ে ফেলেছি। যতটা মনে হয় তারিখ ও স্থান আমার ঠিক মনে আছে ঐ যথেষ্ট। এতো আর কোলকাতা নয় যে, বিয়ে বাড়ির নম্বর মিলিয়ে খুঁজে নিতে হবে। যে গ্রামে বিয়ে হচ্ছে - সে গ্রামের যে-কোন লােককে জিজ্ঞেসলেই বিয়ে বাড়ির সন্ধান অনায়াসেই বলে দেবে।

তবে যতদূর মনে আছে গ্রামের নাম শিমূলতলী! পাঁচ সাত মাইলের মধ্যে তলী সংযুক্ত মাত্র দুটি গ্রাম। শিমূলতলী ও কুলতলী। শিমূলতলীই হবে।

অতএব নির্দিষ্ট দিনে সন্ধ্যার একটু আগেই—আমি শিমূলতলীর উদ্দেশ্যে বেরিয়ে

পড়ি।

কুলতলীতে আমি বহুবার গিয়েছি, কারণ কুলতলীর রথের মেলা বিখ্যাত। - শিমূলতলী বেশী দূর নয়। কিন্তু শিমূলতলীতে আমি আগে কখনও যাইনি। তবে পাঁচ

সাত মাইলের পথ অনায়াসে যাওয়া যাবে। আমি গ্রামের ছেলে পায়ে হাঁটা আমার | অভ্যাস আছে। | দুমাইল পথ চলার পর নদী পেরােতে হ’লাে।নদীর নাম রূপবতী।। - নদীর রূপের কি ছিরি! জল নেই তেমন হাঁটুর উপর কাপড় তুলে অনায়াসে | পেরিয়ে গেলাম। অথচ বর্ষাকালে — এই নদীই ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে। এই নদীর | জন্যেই শিমূলতলীর সঙ্গে আমাদের তেমন যােগাযােগ নেই। | নদী পেরিয়ে হাঁটতে থাকি।নদীর পারেই একটা মুদি-দোকান। মুদিকে জিজ্ঞেস | করি, “শিমূলতলী কোন্ পথে যাব বলতে পারেন?”

মুদি-দোকানে লােকজন নেই, শুধু মুদি বসে সাত সন্ধ্যেয় ধুকছে – বােধহয় | নেশা-টেশা করে।

দু'দুবার ডাকার পর সাড়া পাওয়া গেল। -কি বলছেন? —বলি শিমূলতলী কোন্ পথে যাব?

—যদি সড়ক দিয়ে যান একমাইল ঘুর হবে। জোছনার আলাে আছে মাঠ | দিয়ে গেলে সহজ হবে। | ঠিক আছে, মাঠ দিয়েই যাব। | মুদি সামনের মাঠটা দেখিয়ে বলল –ঐ মাঠ দিয়ে সােজা উত্তরে চলে যান – সামনে একটা তালগাছ দেখতে পাবেন, যেই তালগাছ পাবেনঅমনি বাঁ-দিকে বেঁকে যাবেন তারপর ঐ পথ ধরে চলতে চলতে একটা বড় অশ্বত্থাগাছ দেখতে পাবেন - অশ্বখগাছের ওখান থেকে ডানদিকে বেঁকে যাবেন -ব্যস্ আর একটু গেলেই সবচেয়ে · বড় মুদি-দোকান। ওখানে কি কারাে বাড়িতে যাবেন?”

—হুঁ।

—ঐ বিন্ধুকে জিজ্ঞেস করবেন ও আপনাকে সব বলে দেবে। ব্যস এই বলেই মুদি আবার পূর্বের মতাে ঝিমুতে থাকে।

| আমি মুদির নির্দেশিত পথে চলতে লাগলাম। | মাঠ শেষে হয়ে গেল বটে। কিন্তু তালগাছ আর খুঁজে পাই নি।একটা লােকজনও দেখি না যে তার কাছে বিয়ে বাড়ির হদিশ জিজ্ঞেস করব।

অশ্বত্থ গাছের কাছেএসেই একটা লােকের দেখা পেলাম। আপাদমস্তক কাপ ঢেকে ঠিক গাছটার নীচে ছায়ার মতাে দাঁড়িয়ে আছে, মুখটা তার ভাল করে দেখা যায়

না। ...

আমি চিৎকার করে উঠি,“ কে ওখানে?” | লােকটা নাকি সুরে জবাব দেয় – “ আমি গাে আমি। আপনি কোথেকে আসছে?”

রূপচাঁদপুর থেকে। । বিয়ে বাড়িতে যাবেন তাে?

-হ্যা। —আমার সঙ্গে আসুন।

লােকটা আগে আগে চলতে থাকে, আমি পেছনে পেছনে চলি। ভাবি একে কে পাঠাল। আর আমি যে বিয়ে বাড়ি যাব –তাই বা এ জানল কি করে? অনেক প্রশ্ন মনে ভিড় করে আসে।একে কি বিয়ে বাড়ির কোন লােক পাঠিয়ে দিয়েছে?

অথবা অজয় বরযাত্রী সহ কোলকাতা থেকে বিয়ে বাড়িতে পৌঁছেই কি একে পাঠিয়ে দিয়েছে? কিন্তু আমি যদি সড়কপথে আঁসতাম, তবে এ আমাকে পেত কোথায়? হয়তাে বা সড়কপথেওঁ একজন লােক পাঠিয়ে দিয়েছে।

- যা হােক আগে তাে বিয়ে বাড়ি পৌঁছুই — তারপর আমার সকল প্রশ্নের | সমাধান করা যাবে। মনের প্রশ্ন মনে রেখে লােকটার পিছু পিছু চলতে থাকি।

কিন্তু একি! | লােকটা পথ ছেড়ে হঠাৎ জঙ্গলের পথ ধরছে কেন! একি পথ! ঝােপঝাড় আর কাটায় ভর্তি, এপথে কি মানুষ চলতে পারে?

আমি বিরক্ত হয়ে লােকটাকে জিজ্ঞেস করি,“ একি, পথ ছেড়ে—হঠাৎ জঙ্গল দিয়ে চলছ কেন?”

| লােকটা ফি ফি করে হেসে জবাব দেয়, “ বিয়ে বাড়ি যাবার এটাই পথ গাে।”

জঙ্গলের পথ ধরে লােকটা হনহনিয়ে চলতে থাকে। আমি বিরক্ত হয়ে প্রশ্ন করি, “আর কত দূর?”

লােকটা আবার ফি ফিক করে হেসে দূরের একটা পােড়া বাড়ি দেখিয়ে = জবাব দেয়, “ওই তাে বিয়ে বাড়ি, দেখতে পাচ্ছনা?” . বাতি নেই বাজনা নেই, সে আবার কেমন বিয়ে বাড়ি? লােকটা ডাকাত-ফাকাত ও নয়তাে? তবুও আমি তখন বেপরােয়া –এতদূর এসে আর কোনমতেই ফিরে যেতে রাজী নই। যা থাক কপালে, শেষ দেখে তবে যাব। বাড়ির কাছাকাছি আসতেই --

অজানা আতঙ্কে আমি শিউরে উঠলাম। সারা বাড়ি থমথমে, জীবনে অনেক বিয়ে বাড়িতে ভোজ খেয়েছি ~~~~ কিন্তু এমন বিয়ে বাড়িতে এর আগে কখনও আসিনি।

বাটিটার কাছাকাছি আসতেই নানারকম অদ্ভুত কলরব শুনতে পেলাম। | অনেকটা বিয়ে বাড়ির হৈ-চৈ এর মতাে। হিঃ হিঃ, হাঃ হাঃ, হৈ-হৈ! দরজার সামনেই একটা মায়ামুর্তি দাঁড়িয়েছিল, সে হাত জোড় করে বলল ঃ ভিতরে আসুন, দয়া - করে আসতে আজ্ঞা হােক।

| বিনয়ের অবতার আর কী! নিশ্চয়ই কন্যাপক্ষের কেউ। অজয়কে কাছে পেলে সাংঘাতিক গালাগালি দেব ঠিক করে রেখেছি। এরকম বিয়ের ডােজে নিমন্ত্রণ করা আর বিপদের মুখে ফেলা একই কথা! তবু ভদ্রলােককে অনুসরণ করে ভেতরে ঢুকে গড়ি।

একী!

| ভেতরে কোন আলাে নেই। অথচ কতকগুলি প্রেতমূর্তি এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। যেন কত ব্যস্ত। একটা প্রেতমূর্তি কাছাকাছি এসে ফিসফিসিয়ে বললঃ আপনি। কি রূপচাঁদপুরের উমদো ভূত?

প্রশ্ন শুনে পিত্তি জ্বলে যায়।

আমি তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠে বললাম ঃ আমি মানুষ – ভূত হতে যাব কেন?

প্রেমূর্তি খােনা সুরে বলে ওঠে ঃ এইরে, দেখাে দেখি কি কাণ্ড! জামদো ভূতটা আবার কাকে ধরে নিয়ে এসেছে! এ যে ভূতের বাড়ির বিয়ে। তা এসেছে যখন, তখন কিছু না খাইয়ে শুধু মুখে আপনাকে ফিরে যেতে দেব কেন? বিয়ে বাড়ির ভােজ আপনাকে খেয়ে যেতেই হবে।

| এই বলে, হিমশীতল হাতে কয়েকটা ভূত আমায় ধরে সে কি টানাটানি। | ভােজ খাওয়াবে! আমি তখন প্রাণ নিয়ে পালাতে পারলে বাঁচি! বামুনের ছেলে,

যেই পৈতে হাতে নিয়ে গায়ত্রী মন্ত্র জপতে শুরু করলাম, অমনি ওরা ছিটকে কে কোথায় | পালিয়ে গেল, হদিস পেলাম না। | শেষে আমিও প্রাণভয়ে ঊধর্বশ্বাসে ছুটতে ছুটতে মাঝরাতে বাড়ি ফিরে এলাম। সব কিছু বলার পর আমার চোখ-মুখের চেহারা দেখে বাড়ির সবাই হাসা দূরের কথা, রীতিমতাে তারাও বেশ ভয় পেল।


Author : তারা কুমার ভট্টাচার্য
Date : 2019-07-13 12:41:23

-: advertisement :-

-: advertisement :-

-: advertisement :-

-: advertisement :-

-: advertisement :-

-:Advertisement:-